Saturday, 7 February 2026

 নাটক - পৃথিবী বন্দনা

​নাট্যকার - কৌস্তুভ দে সরকার

(অভিনয়ে - রাজ, বাবন, সুদীপ, প্রকাশ, চন্দন, অপু)


​(বন্ধুরা মিলে লাটাই ঘুড়ি নিয়ে খেলতে বেরিয়েছে। পথের ধারে একটি মৃতপ্রায় গাছের দিকে তাকিয়ে...)
​রাজ : দ্যাখ বাবণ, এই গাছটা কিছুদিন আগেই কত সুন্দর ছিল! ছায়া দিত। আর এখন, গাছটা মরেই গেল প্রায়।
সবাই : (একসাথে) ঠিকই তো রে!
বাবন : জানিস, এই গাছটা আমার জেঠু লাগিয়েছিল।
সুদীপ : উহু, বললেই হল, না? ওটা আমার কাকা লাগিয়েছিল।
সবাই: (একসাথে) ও, তাই নাকি?
রাজ : তা, তোর কাকা এখানে গাছ লাগাতে গেল কেন? তুই কি জানিস? না, মিছিমিছি বলছিস।
সুদীপ : আরে, আমার কাকা তখন এই স্কুলেই পড়ত। তখন ৫ জুন, অরণ্য সপ্তাহে স্কুলে প্রোগ্রাম হত না? তখন ব্লকের থেকে লোক এসেছিল, বন দপ্তরের লোকেরা এই গাছ দিয়েছিল। কাকার হাতেই লাগানো এই গাছ।
রাজ : কিজানি ভাই, হতে পারে। তবে তোর কাকা যদি এখন এই গাছ দেখে না - যা কষ্ট পাবে...
প্রকাশ : হ্যাঁ, কষ্ট তো পাবেই। আচ্ছা, গাছগুলো মরে যাচ্ছে কেন বলতো?
চন্দন : অনেক কারণ আছে, জানিস...
রাজ : তো, তুই জানলে বলনা, দেখি...
চন্দন : আমার এক দাদা আছে, একটা এনজিওতে কাজ করে...
রাজ: তো কি হল?
চন্দন : দাদা বলেছে...
সুদীপ : কি যেন নাম তোর দাদার?
চন্দন : আরে অপু দা, চিনিস না?
রাজ : আর এনজিওটার নাম কি?
চন্দন : ওই যে প্যানাসোনিক, না কি যেন...
রাজ : ও হ্যাঁ, তো অপু দা কি বলেছে রে?
চন্দন : অপুদা বলেছে, এখন সূর্যের তাপ খুব বেড়ে গেছে।
বাবন : ঠিকই তো বলেছে। আগে কিন্তু এত গরম ছিল না। ইস, দুপুরেও আমরা মাঠে ক্রিকেট খেলতে যেতে পারতাম। আর এখন...
রাজ : হুম, গোটা পৃথিবী গরম হয়ে যাচ্ছে। জানি, জানি, একে বলে উষ্ণায়ন। পাহাড়ের সব বরফ, হিমবাহ সব গলে যাচ্ছে। আমার না এগুলো শুনে খুব ভয় করে!
প্রকাশ : ভয় তো পাবারই কথা। দেখিস, পৃথিবীটাই একদিন এভাবে ধ্বংস হয়ে যাবে।
সবাই : (একসাথে) আরে ২১ ডিসেম্বর মনে হয় কিছু একটা হবেই দেখিস...!
সুদীপ : হুম, সবাই তো তাই-ই বলছে।
অজয় : আরে, না রে, কিছুই হবে না, দেখিস...
রাজ : আরে বোকা, শুধু সূর্য যে কাছে আসছে তাই না! সব গাছ কেটে ঘর-বাড়ি বানাচ্ছে না লোক... আমাদের খেলার মাঠও নেই এখন... সব বড় বড় ঘরবাড়ি চারদিকে।
অজয় : ঠিকই রে। রাস্তা আর ঘরের ছাদ ছাড়া ঘুড়ি উড়ানোর জায়গায় পাইনা। আর ওই শয়তান রাজ আমার ঘুড়ি দেখলেই কাটাকুটি খেলে... (রাজ শয়তানের মতো মাথা নাড়ে আর হাসে)
সবাই : (একসাথে) ঠিকই বলেছিস... ও ব্যাটা খুব পাজী...
সুদীপ : হুম, গাছ কাটলেও কিন্তু সেভাবে গাছ আর লাগায়না কেউ।
রাজ : তারপর, নানারকম বিস্ফোরণ, বোমা গুলি, কলকারখানার ধোঁয়া, গাড়ির ধোঁয়া, পরিবেশ একদম শেষ।
সুদীপ : সেদিন তো দেখলাম, উত্তরবঙ্গ সংবাদেও খবর বেরিয়েছে - মোবাইল টাওয়ার কেড়ে নিচ্ছে পাখির প্রাণ। কি ভয়ঙ্কর বল...
প্রকাশ : আর পাখি নেই তো, গাছও নেই!
সবাই : (একসাথে) কেন রে? সেটা আবার কেন?
প্রকাশ: আরে বোকা, পাখিগুলোই তো ফল খেয়ে যেখানে সেখানে বীজ ফেলে দেয়। তখন সেখান থেকে আবার গাছ হয়। পাখি না থাকলে এরকম হবে কেমন করে?...
সবাই : (একসাথে) ঠিক ঠিক।
চন্দন : দাদা বলেছে, ওরা এই নিয়ে নানা জায়গায় নাকি সচেতনতা শিবির করছে।
রাজ : তোর দাদাকে বলিস তো আমাদেরকে ওই দলে নেবে নাকি?
সুদীপ : নানা, ওটা বড়দের ব্যাপার। আমরা বড় হই তারপর ঢুকবো। তার চেয়ে এক কাজ করি চল।
রাজ : কি কাজ রে?
সুদীপ : আমরা নিজেরাই নিজেদের বাড়িতে নানারকম গাছ লাগাবো, আর সবাই কে বলবো গাছ লাগাতে।
প্রকাশ : সেতো নয় করবি। কিন্তু গাছ লাগালে গাছের যত্নও করতে হয়, জানিস তো?
অজয় : সে তো করাই যাবে। কিন্তু গাছ মরে যাবার আরেকটা কারণও আছে, মাটির দূষণ!
রাজ : ঠিকই বলেছিস। এতো প্লাস্টিকের ব্যবহার। পৌরসভাও কিছু করতে পারছে না।
অজয় : ঠিকই বলেছিস ভাই। আবার ওজোন স্তরের ঘনত্বও নাকি কমে গেছে, বাবা বলছিল।
সুদীপ : ঠিকই বলেছে তো।
প্রকাশ: শোন, সরকার থেকেও তো নানারকম প্রকল্প নিচ্ছে।
বাবন : আমার বাবা বলেছে, অযথা জলের অপচয়ও বন্ধ হওয়া দরকার।
রাজ : কি করে হবে? পাড়ার সব ট্যাপ দিয়ে জল পড়তেই থাকে। একটারও মুখে প্যাঁচ নেই। সেদিন দেখি, ব্যাটা দুলাল - আমাদের বাড়ির সামনের ট্যাপের প্যাঁচটা খুলে নিয়ে পালালো। আমি ধরতে গিয়েও পারলাম না।
সবাই : (একসাথে) কেনরে? কি করে ও ওগুলো দিয়ে?
রাজ : জানিস না? ব্যাটা ওগুলো টিন-ভাঙ্গা, লোহা-ভাঙ্গাদের দিয়ে চানাচুর খায়...
সবাই : (একসাথে) ওওও...
সুদীপ : আর, মাটির নীচের জলস্তরও কিন্তু অনেক কমে গেছে এখন। জানিস, সেদিন আমাদের পাশের বাড়িতে টিউবওয়েল বসাচ্ছিল। কতগুলো পাইপ লাগলো...
রাজ : জলের পাশাপাশি বিদ্যুৎ-এর অপচয়ও বন্ধ করা দরকার। আমার বাবা-ভাই, সব সিএফএল বাল্ব লাগিয়েছে ঘরে।
সবাই : (একসাথে) কেনরে? সিএফএল লাগালে কি হয়?
রাজ : আরে বোকা, সিএফএল অল্প ভোল্টেজেই জ্বলে, আবার এক বছরের মধ্যে খারাপ হলে গ্যারান্টিও থাকে, দোকানদার আবার নতুন দেয়।
​সুদীপ : হুম, তোর মুখ দেখে দিয়ে দিবে, বারবার! ওটা একবার-ই মাত্র দেয়। তারপর আর দেয় না।
রাজ : আচ্ছা, রাখ ওসব কথা। তার চেয়ে এক কাজ করি, চল...
সবাই : (একসাথে) কি কাজ, বল?
রাজ : চল, আমরা, আমাদের স্কুলের বনমালী স্যারকে গিয়ে বলি, স্যার, আমরা স্কুলে একটা ক্লাব বানাবো।
বাবন : কি হবে তাতে?
সুদীপ : কেন, স্কুলে তো ক্লাব আছেই!
রাজ : কি ক্লাব?
সুদীপ : কেন? ইকো ক্লাব! সবুজ বাহিনী। নাইনের দাদারাই তো আছে।
রাজ : তবে চল, স্যারকে বলি, আমাদেরও ওই ক্লাবে নিতে হবে। আমরা স্কুল থেকেই টিফিনবেলায় প্রতিদিন গাছ লাগাবো, শহরের জঞ্জাল পরিষ্কার করতে বেরোব, বিভিন্ন জায়গায় পরিবেশের প্রচারে যাবো, নাচ গান নাটক - সব করবো। দারুন মজা হবে, মাইরি।
সবাই : (একসাথে) ঠিকই বলেছিস। চল, আজ থেকে সবাই শপথ নিই। পরিবেশ রক্ষায় আমরা সবাই সজাগ থাকবো। সবাই একসাথে কাজ করবো।
​(সবাই পরস্পরের মুখের দিকে চাওয়া-চায়ি করে বলে -  ঠিক ঠিক। তারপর হাতে হাত ধরে উপরের দিকে তুলে ধরে বলে - )
আমরা সবাইকে জানিয়ে দিতে চাই -
একটি গাছ অনেক প্রাণ, গাছ লাগান, প্রাণ বাঁচান।

Tuesday, 16 December 2025

 বজরংবলী 🖊️ কৌস্তুভ দে সরকার 


​পরিতোষের জীবন ছিল এক সাজানো নাটকের প্রথম দৃশ্য। তার প্রথম প্রেম ছিল উদার আকাশের মতো; কিন্তু বাবা-মায়ের কঠিন বুদ্ধিদীপ্ত চাল সেই আকাশকে আড়াল করে দিল। বেনারসের প্রভাবশালী বর্মণ পরিবারের মেয়ে, যার রূপে এবং বুদ্ধিমত্তায় ছিল তীক্ষ্ণ শান, সেই রূপসা এসে দাঁড়ালো পরিতোষের পাশে। বাবার ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে পরিতোষ বিয়েতে রাজি হলো।

​প্রথম দিনগুলি ছিল সমঝোতার এবং শীতল দূরত্বের। পরিতোষের হৃদয়ে তখনো প্রথম প্রেমের পুরোনো সুর বাজত। কিন্তু রূপসা ছিল ধৈর্যশীল এবং লক্ষ্যভেদী। তার নীরব, অথচ দৃঢ় উপস্থিতি আর ত্রুটিহীন পরিচালনা কৌশল পরিতোষকে ধীরে ধীরে এক নতুন অভ্যস্ততায় বেঁধে ফেলল। ছয় মাসের মধ্যে, সেই "আপনি" সম্বোধন কখন যে মিষ্টি "ডারলিং"-এ পরিণত হলো, পরিতোষ নিজেও টেরও পেল না।

​রূপসার কৌশল শুরু হলো অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে। প্রথমে এলো মায়ের দিক। "ডারলিং, মা তো শরীর খারাপ হলেই অযথা চিন্তা করেন, তাই অফিসের কথাগুলো উনাকে না বলাই ভালো।" তারপর দাদার ব্যবসার সামান্য ত্রুটি নিয়ে ফিসফিস: "ভাইয়ার এই ডিসিশনটা কিন্তু ঠিক হয়নি, তোমারই সব দেখতে হবে।" পরিতোষ দেখল, প্রতিটি বিষয়ে রূপসার যুক্তি এতটাই নিখুঁত যে তার আর অন্য কিছু ভাবার সুযোগ রইল না। ক্রমে, মা, ভাই, পুরোনো বন্ধু—সবাই এক এক করে তার দৈনন্দিন জীবনের বৃত্ত থেকে ছিটকে যেতে লাগলো। পরিতোষ দেখল, সে ক্রমশ রূপসার তৈরি করা এক আরামদায়ক, কিন্তু নিশ্ছিদ্র জালে আটকা পড়ছে।

​জালে সম্পূর্ণরূপে পড়ার পর, রূপসার শাসন শুরু হলো। এবং এটি কোনো চিৎকার বা ঝগড়া নয়; বরং শান্ত, অবিচল নির্দেশ।

​"আজ ওটা নয়, এই নীল পাঞ্জাবিটা পরবে—ওতে তোমাকে স্মার্ট লাগে।"

"অফিসের পর আজ সোজা বাড়ি এসো, ওই আকাশের সাথে গল্প করে সময় নষ্ট করার দরকার নেই।"

"চুলটা কিন্তু কালকেই কাটতে হবে। আর ওই ধরনের জুতো পরবে না, ওটা পুরনো ফ্যাশন।"

​কোথায় যাবে, কার সাথে কথা বলবে, কী খাবে (কম তেল, বেশি প্রোটিন, চিনি কম), এমনকি ঘুমের সময়সীমাও এখন রূপসার সূক্ষ্ম নজরদারিতে। পরিতোষ দেখল, তার নিজের বলে কিছু নেই; আছে শুধু রূপসার তৈরি করা এক নিখুঁত রুটিন।

​মনের গহীনে, এক গোপন অভিমান এবং অদ্ভুত শ্রদ্ধা নিয়ে সে রূপসার নতুন নাম রাখল—"বজরংবলী"।

​পরিতোষের এই নামকরণের যুক্তি ছিল দ্বিমুখী। এক, বজরংবলী যেমন সামান্য উল্টোপাল্টা দেখলেই গদা উঁচিয়ে চরম প্রহার করতে পারেন, রূপসাও তাই। একটি অননুমোদিত পুরনো বন্ধুর ফোনকল অথবা আধ ঘণ্টা দেরি করে বাড়ি ফেরা, না বলে কোথাও ঘুরে আসা, অমনি তার শান্ত চোখের দৃষ্টি এক মুহূর্তেই তীক্ষ্ম হয়, যা যেকোনো গদার আঘাতের চেয়েও বেশি কার্যকর।

​কিন্তু দ্বিতীয় দিকটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। বজরংবলী যেমন তার ভক্তের সমস্ত ভার নেন, রূপসাও তাই। পরিতোষকে এখন আর কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হয় না। সব কিছু ঠিক করা আছে। তার পোশাক, তার খাবার, তার সামাজিক দায়িত্ব, এমনকি তার ভবিষ্যৎ পর্যন্ত। পরিতোষ যেন এক সোনার খাঁচায় থাকা মূল্যবান পাখি। খাঁচাটি সুন্দর, নিরাপদ, কিন্তু তার ডানা নেই। রূপসা তার সমস্ত মঙ্গলের ভার নিয়েছে, বিনিময়ে চেয়েছে শুধু তার স্বাধীনতাটুকু।

​এরই মাঝে তাদের জীবনে এলো তাদের সন্তান, অঙ্গদ।

​অঙ্গদের আগমনে পরিতোষ ভেবেছিল, হয়তো রূপসার মনোযোগ ভাগ হবে, তার ওপর থেকে নজরদারি কমবে। কিন্তু ঘটল তার উল্টো।

​রূপসা এবং অঙ্গদ—এই দুই শক্তিতে পরিতোষের খাঁচাটি আরও মজবুত হয়ে উঠল। অঙ্গদ ছোটবেলা থেকেই শান্ত এবং মায়ের মতোই নিয়মানুবর্তী। রূপসার সামান্য ইশারাই তার কাছে আদেশ।

​যখন পরিতোষ কোনো পুরনো বন্ধুকে ফোন করতে চায়, অঙ্গদ এসে বাবার পাশে বসে জিজ্ঞাসা করে, "বাবা, কার ফোন? আমার হোমওয়ার্কটা একটু দেখে দেবে?" তারপর সব কথা গিয়ে মাকে বলে দেয়।  রূপসার চোখের ইঙ্গিত তখন স্পষ্ট।

​অফিসের কোনো ট্যুরে বেশি দিন থাকতে হলেই রূপসা শান্ত স্বরে বলে, "ঠিক আছে ডার্লিং, কিন্তু অঙ্গদ তোমাকে ছাড়া ঘুমোতে পারে না। ওর জন্য কষ্ট হবে না?"

​পরিতোষ বুঝতে পারে, অঙ্গদ হলো বজরংবলীর হাতের সেই দ্বিতীয় গদা। যখন রূপসার নিজের শক্তি একটু কমে আসে (যেমন, রূপসার নিজের কাজের চাপ থাকলে, পূজার্চনা থাকলে) তখন অঙ্গদ তার আবেগ এবং আবদার দিয়ে পরিতোষকে ধরে রাখে।

​পরিতোষের স্বাধীনতা এখন কেবল দুটি জিনিসের মধ্যে সীমাবদ্ধ: বাথরুম আর অফিসের ল্যাপটপ। বাথরুমে সে চুপ করে একটু দীর্ঘশ্বাস নেয়, আর ল্যাপটপে কাজের ফাঁকে গোপনে পুরনো বন্ধুদের ফেসবুক প্রোফাইল দেখে মুছে ফেলে।

​পরিতোষের জীবন এখন একটা নিখুঁত ছাঁচে ঢালা। সে একজন সফল ব্যবসায়ী, একজন অনুগত স্বামী এবং একজন যত্নশীল বাবা। কিন্তু সেই সবকিছুই রূপসার হাতে রচিত চিত্রনাট্যের অংশ।

​বজরংবলী এবং অঙ্গদ, এই যুগলবন্দী তাকে এক এমন জীবনে আটকে রেখেছে, যেখানে প্রতিটি কাজ মঙ্গলজনক, প্রতিটি পথ নিরাপদ, কিন্তু সেই পথের শেষে তার নিজের কোনো ইচ্ছা নেই। পরিতোষ এখন আর মানুষ নয়, সে একটি ব্র্যান্ড, যা রূপসার তত্ত্বাবধানে নিখুঁতভাবে পরিচালিত। বাইরে থেকে সবাই তাকে দেখে ঈর্ষা করে; আর পরিতোষ, মনে মনে মুচকি হেসে বলে: "আমার মতো বজরংবলী সবার ঘরেই আছে। কাজেই সাধু, সাবধান। একটু উল্টোপাল্টা হলেই কিন্তু আর রেহাই পাবে না। দিবে গদা দিয়ে। বজরংবলী আর অঙ্গদের মঙ্গলের বাইরে কারো অস্তিত্বের কোনো স্থান নেই!"

 মুখোশ 

কৌস্তুভ দে সরকার 


​মেদিনীপুরের রাহা রাজবাড়ী থেকে সুলতানি আমলের ‘শাহি-নকশ’ নামক ক্রিপ্টোগ্রাফিক আংটি চুরির খবরটা যখন বিলাত ফেরত তরুণ অপরাধ-বিশেষজ্ঞ অরূপরতন রাহা-র কাছে পৌঁছালো, তখন সে বিস্মিত নয়, বরং কৌতূহলী হলো। তার কাকা প্রতাপরতন রাহা মেদিনীপুরের রাহা রাজপরিবারের শেষ বংশধর, বিরাট বিত্তশালী। তাঁর রাজবাড়ী বহু পুরনো, কিন্তু ভেতরে আধুনিক সিন্দুক। প্রতাপরতন শখের ঘোড়দৌড় আর পুরনো আমলের জিনিসপত্র সংগ্রহের জন্য পরিচিত। 

অরূপরতন : "কাকা, আংটিটা চুরি গেল কীভাবে?"

​প্রতাপরতন: "আগুন! চারদিকে আগুন আর ধোঁয়া। সিন্দুক ভাঙার কোনো শব্দই শুনতে পাইনি।"

​অরূপরতন লক্ষ্য করল, আশ্চর্যজনকভাবে, আগুনটা সিন্দুকে লাগেনি। শুধু তার আশেপাশের শুকনো ঝোপে লেগেছিল। তার সন্দেহ হলো। এত নিখুঁত চুরি, এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো 'শাহেনশা' আছে।

​তার এই নতুন তদন্তে সঙ্গী হলো তার ছোটবেলার বন্ধু, স্থানীয় সাংবাদিক ও প্রযুক্তি-পাগল পাপুন সেন। পাপুনের আছে থাকে গোপন ক্যামেরা, ড্রোন, এবং সবচেয়ে বড় কথা, শহর-গ্রামের সব খবর তার নখদর্পণে।

​এরপর কয়েক মাসের মধ্যে, বেশ কয়েকটি জায়গায় ডাকাতির ঘটনা ঘটে চললো। পুলিশের পক্ষে কিনারা করে ওঠা মুশকিল হচ্ছিল। তারপর, পুরুলিয়ার জঙ্গল-ঘেরা 'শান্তিনিবাস রিসর্ট'-এ নৃত্যশিল্পী রিপার মর্মান্তিক মৃত্যু অরূপরতনকে বিচলিত করে তুললো। সেখানেও জঙ্গলে কে বা কারা আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল। এই ধরনের অপরাধগুলো কে বা কারা সংঘটিত করছে তা জানতে সে তৎপর হয়ে উঠলো। রিপার মার্ডার এর সাথে তার কাকার সিন্দুক চুরি হওয়ার কোনো সূত্র আছে কি না তা খোঁজার সে চেষ্টা শুরু করলো। 

শান্তিনিবাস রিসর্টের একটি পরিত্যক্ত কটেজে পাওয়া গিয়েছিল রিপার নিথর দেহ। রিপা, রূপসী, কিন্তু জীবনযুদ্ধে ক্লান্ত এক ড্যান্সার। সে আসত কলকাতা থেকে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট দেখা যায়, শরীরে আঘাতের চিহ্ন নেই, কিন্তু তার চোখ দেখে মনে হচ্ছিল সে কিছু দেখে মারাত্মক ভয় পেয়েছিল। চোখে আতঙ্ক জমে ছিল।

​অরূপরতন ও পাপুন পুরুলিয়া পৌঁছল। তারা জানতে পারল, মৃত্যুর আগের দিন রাতে সে একটি বার-এ ডান্স করছিল এবং সেদিন রাতে তার সাথে একজনের বেশ দীর্ঘ কথোপকথন হয়েছিল। লোকটি ছিল ছদ্মবেশী। পাপুন সেই বর্ণনার ভিত্তিতে কিছু সফটওয়্যার ব্যবহার করে একটি ছবি তৈরি করল, যা তাদের হয়তো কোনো সূত্রের খোঁজ দিতে পারে। 

​শহরের ভিড়ভাট্টা ছাড়িয়ে যেখানে কংসাবতী নদী বাঁক নিয়েছে তরবারির মতো, সেখানেই ভবানীশঙ্কর মিত্র বাবুর প্রাসাদোপম বাড়ি। নিপাট ভদ্রলোক, অত্যন্ত সজ্জন, পশুপ্রেমী,  সমাজসেবী, সর্বোপরি মানবদরদী ভবানীবাবু। পরনে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি, মুখে লেগে থাকা মৃদু হাসি, চুলগুলি উল্টো করে আচড়ানো। সকালে নদীর ধারে তার অ্যালসেশিয়ান অ্যালাস-কে নিয়ে প্রাতঃভ্রমণ করেন, সারাটা দিন কেটে যায় নানান কর্মব্যস্ততায়, সন্ধ্যায় স্থানীয় ক্লাবে তরুণদের অনুপ্রেরণামূলক বক্তৃতা দেন। তাঁর বক্তৃতা শুনতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসে; ভোট এলেই সব দলের নেতা-মন্ত্রীরা তাঁর বাড়িতে ভিড় করেন। সবমিলিয়ে একজন নামীদামী প্রভাব প্রতিপত্তিশালী লোক এই ভবানীবাবু। 

​কিন্তু রাতের ভবানীশঙ্কর আবার ভিন্ন। তাঁর 'বার্ড রুম'-এর মৃদু লাল আলোয় বসে তিনি দেখেন তার পুষে রাখা পাখিদের, বিশেষত, ব্ল্যাক কাইট (কালো চিল)-দের একটি দল। এরা বাজপাখি ও ঈগলের প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত এবং বিভিন্ন মহাদেশে এদের দেখা যায়; এরা খুব চালাক, সুযোগসন্ধানী এবং আগুন ব্যবহার করে শিকার করার মতো আচরণও করে। যাদের তিনি বলেন 'ফায়ারহক'। এই কক্ষের এক কোণে একটি পুরনো লাট্টু রাখা থাকে, যা ভবানীশঙ্কর মাঝে মাঝে ঘোরান। তিনি মনে করেন, লাট্টুর ঘূর্ণন তার তার দিনের শুরু আর রাত্রি শেষের প্রতীক। আর সেখানেই এক আলমারিতে রাখা আছে বেশ কিছু সুন্দর সুন্দর পুরুষ মুখোশ। দেখে মনে হয় সেগুলি একদম ন্যাচারাল।  অরূপরতন সেগুলো মাঝেমধ্যে পরে আয়নায় বারবার নিজের মুখ দেখেন। এতে তিনি বেশ মজা পান।

​ভবানী বাবুর প্রাসাদোপম বাড়ি দেখে ওদের সেই বাড়িতে থাকার খুব লোভ হলো। অরূপরতন পাপুনকে উৎসাহিত করল। বলল, "চল উনার বাড়িতে থাকার একটা ব্যবস্থা করি। "

"ভবানীশঙ্করবাবু কেন আমাদের মতো সামান্য মানুষের  সঙ্গে কথা বলবে, বা থাকতে দেবে? - পাপুন বলল।

অরূপরতন ততক্ষণে তার পকেট থেকে ভবানীশংকর বাবুকে লেখা মেদিনীপুরের বিধায়কের একটি চিঠি বের করে ফেলেছে। সেটি পাপুনকে দেখিয়ে সে বলে, " আরে আমি কি অত কাঁচা খেলুড়ে নাকি? এখানে যে কয়দিন থাকবো, তার জন্য ফ্রিতে থাকা খাওয়ার পাকা ব্যবস্থা করে এনেছি। মেদিনীপুরের বিধায়ক সুচন্দনবাবু আর ভবানীবাবু দুই অভিন্ন হৃদয় বন্ধু। তাই তার চিঠি নিয়েই চলে এসেছি। 

​অরূপরতন ও পাপুন ভবানীশঙ্করের প্রাসাদোপম বাড়ির অতিথি হলেন। ভবানীশঙ্কর তাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালেন। সাদা পাঞ্জাবি, মৃদু হাসি – যেন মানবিকতার প্রতিমূর্তি।

​ভবানীশঙ্কর : "দ্যাখো অরূপরতন, আমার জীবনদর্শন খুব সহজ। জীবনে দুটি জিনিস দরকার—শৃঙ্খলা এবং পরিবেশের প্রতি সহানুভূতি। আমি পাখি পুষি, কারণ ওরা আমাকে স্বাধীনতার পাঠ দেয়। তোমরা এসো, আমার ‘বার্ড রুম’ দেখবে।"

​'বার্ড রুম'-এর মৃদু লাল আলোয় তারা ব্ল্যাক কাইটদের দেখল। অরূপরতন লক্ষ্য করল, লাল আলোয় পাখিদের চোখগুলো অস্বাভাবিকভাবে জ্বলজ্বল করছে। কোণে রাখা লাট্টুর দিকে দেখিয়ে অরূপরতন (কৌশলী হয়ে): "স্যার, এই লাট্টুটা কি আপনার কোনো প্রতীক? আর ওই মুখোশগুলো? 

ভবানীশঙ্কর: "হাঃ হাঃ! ঠিক ধরেছো। এটা আমার দিনের শুরু আর রাত্রির শেষের প্রতীক। ঘুরতে থাকে, ঘুরতে থাকে... যেমন জীবনের গোপন চক্র। আর মুখোশগুলো আমার খুবই পছন্দের। বলে তিনি হাসতে হাসতে তার অ্যালাস এর গায়ে হাত বুলিয়ে দিলেন।

​ওদিকে, পাপুন নিঃশব্দে একটি পোর্টেবল স্ক্যানার দিয়ে ঘরের বাতাসে থাকা ধুলিকণা স্ক্যান করতে লাগল। 

​অরূপরতন: "স্যার, আপনার পাখিগুলো দারুণ। আর, অ্যালাস কি আপনার সব সময়ের সঙ্গী?"

ভবানীশঙ্কর: "অ্যালাস? সে আমার ছায়া। ওর আনুগত্য প্রশ্নাতীত। দাঁড়াও আমি তোমাদের জন্য চা-পানের ব্যবস্থা করি।" এই বলে ভবানীশংকর বাবু ভেতর ঘরের দিকে চলে গেলেন। 

​এরই মধ্যে পাপুনের স্ক্যানারে একটি অদ্ভুত ফলাফল এলো। বাতাসে ফসফরাসের অতি ক্ষুদ্র কণা, যা সাধারণত আতশবাজিতে বা বিশেষ ধরনের বারুদে ব্যবহৃত হয় এবং অ্যালাসের কলার থেকে আসা একটি অতি ক্ষীণ রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি সিগন্যাল।

​অরূপরতন বুঝতে পারল না ব্যাপারটা কি। 

​সেদিন রাতে ভবানীশঙ্কর তাদের জন্য নৈশভোজের ব্যবস্থা করলেন। ভবানীশঙ্কর যখন বাইরে গেলেন, পাপুন অ্যালাসের কলার থেকে সিগন্যাল ট্র্যাক করে দেখল – সিগন্যালটি কংসাবতী নদীর একটি নির্দিষ্ট বাঁকের দিকে যাচ্ছে।

​অন্যদিকে অরূপরতন চুরির রহস্যের কেন্দ্রে পৌঁছানোর জন্য যারপরনাই  চেষ্টা করে চলেছে।  'শাহি-নকশ' আংটি। সে তার কাকার রাজবাড়ীর নকশা মেলে ধরে তা পুনরায় বিশ্লেষণ করা শুরু করলো। প্রতাপরতনের সিন্দুক আধুনিক হলেও, সিন্দুকের ভিত্তিটি ছিল রাজবাড়ীর দেয়ালের সঙ্গে সংযুক্ত। সেখান থেকে আংটি চুরির ক্ষেত্রে আগুনের কি সম্পর্ক? এইসব ভাবতে ভাবতে একটি সিগারেট টানতে টানতে অরূপরতন ভবানীবাবুর ঘরের একটি আলমারিতে রাখা পুরনো বইপত্র দেখছিল। হঠাৎ 

অরূপরতনের চোখ পড়ল ফেলুদা সমগ্রের শেষের পাতায় রাখা একটি ছবির দিকে। ছবিটি দেখতে গিয়ে সেটি বই থেকে মাটিতে পরে গেল। আর ততক্ষণে ভবানীবাবুর গলার আওয়াজ পেয়ে অরূপরতন ঝটপট করে ছবিটি তুলে সেটি পকেটে পুরে নিল। 

পরদিন সারাদিন ভবানীবাবু অরূপরতনদের নিয়ে নদীর পাড় ধরে অনেকটা ঘুরে বেড়ালেন। ঘুরতে ঘুরতে অরূপরতনদের এখানে আসার উদ্দেশ্য জানতে পেরে ভবানীবাবু তাদের বললেন, "বা:, দারুন ব্যাপার তো। তোমার মতো এরকম একজন মানুষের দেখা পাওয়া তো বেশ ভাগ্যের ব্যাপার। জানো,  আমারও একসময় গোয়েন্দাগিরিতে খুব শখ ছিল। কিন্তু সময় করে উঠতে পারিনি। যাকগে, শোনো, তোমরা এখানে যে কয়দিন আছো, আরামসে থাকো। ঘোরো ফেরো। আমার তো বেশ নামডাক এ শহরে।  তোমরা কোনো দ্বিধা করবে না। যখন যে বিষয়ে সাহায্য দরকার আমাকে বলবে, আমি সবরকম সাহায্যের জন্য সবসময় প্রস্তুত।" 

​সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে অরূপরতন কলকাতা পুলিশের অতিরিক্ত সুপার দীপাঞ্জন সান্যাল-এর কাছে ফোন করল: "স্যার, আমি চেষ্টা করছি রহস্যের জাল উন্মোচনের।  আপনি কিন্তু তৈরি থাকবেন। যেকোনো সময় আপনাকে প্রয়োজন হতে পারে। 

অরূপ রতনের কথা শুনে পাপুন একটু অবাকই হলো। অরূপরতন কি এমন পেয়েছে যে সে এরকম করে বললো পুলিশ অফিসারকে। যাইহোক, 

পরদিন খবরের কাগজ পড়ে তারা জানতে পারল, রিপার প্রেমিক পুলক, যে কিনা ড্রাগ মাফিয়া চক্রের ছোট ডিলার, সে নিখোঁজ। অরূপরতন অনুমান করল, রিপার মৃত্যু কেবল প্রতিশোধ নয়, বরং একটি গোপনীয়তার প্রাচীর হতে পারে।

হয়তো, রিপাকে পুলক নয়, বরং ড্রাগ মাফিয়াদের হেডই মেরেছে। কারণ রিপা পুলককে ভালোবেসে তার অন্ধকার জগৎ থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিল। রিপা স্বপ্ন দেখত দুজনের এক শান্ত নিরিবিলি জীবন। এসব নিয়ে পুলকের সাথে ঝগড়া, মান-অভিমান লেগেই থাকত এবং তার কাছে কোনো অত্যন্ত গোপন তথ্য ছিল। রিপা কোনো নেটওয়ার্কের গোপনীয়তা ভাঙছিল। তাই পুলকের হেড রিপাকে সরাতে বাধ্য হল।

​অরূপরতন বোঝার চেষ্টা করছিল, তার কাকার চুরি যাওয়া আংটিটার সাথে রিপার মৃত্যুর কোন সম্পর্ক আছে কিনা। তার মনে হল, আংটিটা ছিল একটি অ্যান্টিক, যা এক বিশেষ ধরনের ক্রিপ্টোগ্রাফিক কোড লুকিয়ে রাখত। এই কোড ব্যবহার করে একটি নির্দিষ্ট এয়ার-ট্রেড-রুট ধরা হয়, যা সাধারণ রাডারে ধরা পড়ে না, বরং চোরাই মাল পাচারের নিরাপদ রুট তৈরি করে। আর রিপা হয়তো এইসব জেনে গিয়েছিল। 

​অরূপরতন ও পাপুন ছক কষল। তারা কলকাতা পুলিশের অতিরিক্ত সুপার দীপাঞ্জন সান্যাল-এর সঙ্গে আবার যোগাযোগ করল। বলল, গোপনে 'বড় মাছ' ধরতে হলে আজ রাতেই চলে আসুন। একটি শর্তে দীপাঞ্জনবাবু রাজি হলেন, তা হল, ক্রিমিনালকে হাতেনাতে ধরতে হবে।

​অরূপরতন এবার ফাইনাল ফাঁদ পাতল। পাপুন একটি ভুয়ো খবর দ্রুত ছড়িয়ে দিল যে, রাহা রাজপরিবারের একটি বিরল পান্না ও একটি পুরনো সুলতানি পুঁথি কংসাবতী নদীর সেই বাঁকে একটি গোপন কুঠুরিতে লুকিয়ে আছে, বলে খবর পাওয়া গেছে। ​শুনে ক্রিমিনাল গ্যাং নিশ্চয়ই প্রলুব্ধ হবে। দেখা গেল সত্যি সত্যিই, রাত দুটোয় এক দুষ্কৃতী তার দলবল নিয়ে কংসাবতীর ধারের কাছে তৈরি। আর সেখানে নদীর ধারে ঘুরে বেড়াচ্ছে একটি কুকুর। সে যখনই নদীর জলের গভীরে গুপ্তধনের খোঁজে ডুব দিতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই দীপাঞ্জন সান্যালের নেতৃত্বে পুলিশ বাহিনী চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলল।

​অরূপরতন (দৃঢ় কণ্ঠে): "ভবানীশঙ্কর মিত্র, ভবানীশঙ্কর মিত্র, আপনার লাট্টু থেমে গেছে। 

ভবানীশঙ্কর : কে ভবানীশঙ্কর? এখানে ভবানীশঙ্করকে কোথায় পেলেন?  ভালো করে দেখুন তো, এই মুখ ভবানীশঙ্করের সাথে মেলে কি না। 

এই বলে ভবানীবাবু তার ইমেজ বজায় রাখার জন্য মুখোশের আড়ালে নানাভাবে প্রমাণ করতে চাইলেন যে তিনি অন্য কেউ, ভবানীশংকর নন। কিন্তু অরূপরতনও কম যায় না। সে ভবানী বাবুর আসল পরিচয় জানতে পেরে গিয়েছে। কারণ, রিপার মৃত্যুর আগের দিন রাতে সে যার সাথে কথা বলছিল পাপুন তার যে স্কেচ তৈরি করেছিল, সেই স্কেচের সাথে মুখের মিল ছিল ভবানীশংকর বাবুর বইয়ের ভিতরে পাওয়া সেই ছবিটিতে। অরূপরতন তাতেই সিওর হয়ে গিয়েছিল যে ভবানীশংকর বাবুই স্কেচের সেই লোক।

অরূপরতন : "আলবাত মিলবে। এই দেখুন,  আপনার মুখোশ আমি টেনে খুলে দিলাম।" বলেই অরূপরতন এক টান দিয়ে ভবানীশঙ্করের মুখ থেকে তার মুখোশ টেনে খুলে ফেলে দিল। আর সাথে সাথেই সেই স্কেচ করা ছবির সাথে একদম হুবহু মিল পাওয়া যায় এরকম একটি মুখের দেখা পাওয়া গেল।  

অরূপরতন : সবাই দেখুন, এই সেই অরিজিনাল ভবানীশঙ্কর। উনার বাড়িতে একটি বইয়ের থেকে পাওয়া একটি ছবিতে আমি উনাকে আবিষ্কার করি। রিপার মার্ডারের দিনে যাকে অনেকক্ষণ রিপার সাথে গল্প করতে দেখা গিয়েছিল। সেই স্কেচের সাথে ওই মুখের মিল আমি পেয়েছিলাম। আর বাড়িতে বা সমাজে উনি অন্য এক মুখোশ পরে ঘুরে বেড়াতেন। আজকে নদীর ঘাটেও এসেছিলেন তিনি অন্য মুখোশ পরে। যাতে কেউ বুঝতে না পারে। এভাবেই নানান মুখোশের আড়ালে প্রকৃত অপরাধ ও অপরাধীকে গোপন করে চলছিলেন ভবানীশংকর। 

এবার অরূপরতন ভবানীশঙ্করের দিকে তাকিয়ে বলা শুরু করল, "ভবানীশঙ্কর, আপনি ফায়ারহককে ব্যবহার করে নজর ঘোরাতেন, আর অ্যালাসের মতো প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুরকে দিয়ে চুরি করাতেন। রিপা এই সত্য জেনেছিল, তাই তাকে সরালেন। 'শাহি-নকশ'-এর ক্রিপ্টোগ্রাফিক কোড আপনার চাবিকাঠি হতে পারতো। আপনি আংটিটি চুরি করেছিলেম তার ভেতরের কোডটি পাওয়ার জন্য। আপনি 'ফায়ারহক' ব্যবহার করতেন আগুন লাগিয়ে পুলিশ আর গোয়েন্দাদের দৃষ্টি ভিন্ন দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য। আসল চুরিটা হতো 'অ্যালাস' এবং আপনার দলের মাধ্যমে, যখন চারদিকে আগুন আর ধোঁয়ার কারণে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতো। আর সেই মুহূর্তে একটি নির্দিষ্ট এয়ার ট্র্যাফিক রুটের আড়ালে হেলিকপ্টার ব্যবহার করে মাল পাচার করতেন। রিপা পুলকের মাধ্যমে জেনে গিয়েছিল যে আপনি ব্ল্যাক কাইট দিয়ে আগুন লাগান, কিন্তু আসল চুরিটা অ্যালাসের সঙ্গে আপনার লোকজন করে। এই তথ্য ফাঁস করার হুমকি দেওয়ায় তাকে মরতে হয়।

​ভবানীশঙ্কর হাসল। সেই নিপাট ভদ্রলোকের হাসি। "তুমি শুধু একটা অংশ জানো, অরূপরতন। এই লাট্টু ঘোরার শেষ নেই।"

​হঠাৎ করেই, ভবানীশঙ্করের লোকজনের একটি অংশ পুলিশের ওপর গুলি চালাল। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলো। এই সুযোগে অ্যালাস নদীর দিকে দৌড়ে পালাল। অ্যালাসের কলারের সিগন্যাল ট্র‍্যাক করে পাপুন নদীর একটি বিশেষ জায়গায় পৌঁছাল।

​পাপুন চিৎকার করে উঠল: "অরূপরতন! এখানে! নদীর বাঁকে!"

​পুলিশের গুলির মোকাবিলা শেষ হতেই অরূপরতন দেখল, কংসাবতী নদীর বাঁকের নিচে, পাথরের আড়ালে, ভবানীশঙ্করের জল-প্রতিরোধী গোপন গুদাম। অ্যালাসের কাজ ছিল ভবানীশঙ্করের ধরা পড়ার আগে সেই গুদামের শেষ মালপত্রগুলি সরিয়ে ফেলা। কিন্তু পাপুনের প্রযুক্তি তাকে সেই কাজে সফল হতে দেয়নি। গুদামে পাওয়া গেল চুরি যাওয়া সব সম্পদ।

​ভবানীশঙ্কর ধরা পড়ল। 'বার্ড রুম'-এর লাল আলো নিভে গেল। অরূপরতন ও পাপুন তাদের প্রথম বড় রহস্যভেদ করে তাকালো নদীর দিকে।

Monday, 13 October 2025

 

দেবদারু আর কনকের প্রেম / কৌস্তুভ দে সরকার

দেবদারু  আর কনক  দু'জনেই কলকাতার  উপকণ্ঠে  এক  পুরোনো জমিদার বাড়ির বাসিন্দা। দেবদারু সেই বাড়ির  বিশাল  উঠোনের শতবর্ষীয় গাছ, আর কনক ছিল জমিদার বাড়ির ঠাকুরদালানে রাখা মা দুর্গার প্রতিমার চোখের মণি।

দেবদারু বহু শতাব্দী ধরে দাঁড়িয়ে  দেখেছে কত প্রজন্ম, কত পূজা। কনকও শত বছর ধরে সেই একই প্রতিমার অংশ। তাদের দেখা হতো শুধু শরৎকালে, যখন দেবদারু তার পেলব সবুজ পাতা ঝরিয়ে হালকা হত এবং কনকের চোখ তৈরি হত। দেবদারুর চোখ ছিল তার ডালপালা, যা পূজার সময় ঠাকুরদালানের দিকে ঝুঁকে থাকত, আর কনকের চোখ ছিল সেই স্ফটিকের মতো মণি, যা এক অপলক দৃষ্টিতে দেখত বাহিরের জগৎ।

তাদের প্রেম ছিল নিঃশব্দে, নিশ্চুপে , গন্ধের আর দৃষ্টির বিনিময়। দেবদারু তার ডালে প্রথম শিউলি ফোঁটার বার্তা দিত বাতাসে, সেই গন্ধ পেত কনক। আর কনক, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমীর তীব্র আলোর ঝলকানিতে দেবদারুর পাতায় প্রতিফলিত করত এক পবিত্র জ্যোতি, যেন সেই আলোয় দেবদারুর ক্লান্তি মুছে যেত।

বছর, পূজার কয়েকদিন আগে, এক প্রবীণ শিল্পী মূর্তির রূপটান করতে এসে লক্ষ্য করলেন যে মা দুর্গার প্রতিমার ডান চোখের মণিটি সামান্য নড়ে গিয়েছে। কিন্তু আশ্চর্য হয়ে দেখলেন, মণিটি নড়েনি, বরং সেটি যেন প্রতিমার গণ্ডি ছেড়ে দেবদারু গাছের দিকে তাকিয়ে আছে।

অষ্টমীর সন্ধিপূজা যখন শুরু হলো, তখন এক অলৌকিক ঘটনা ঘটল। এক ঝলক তীব্র আলোয় গোটা ঠাকুরদালান আলোকিত হয়ে উঠল। সবাই দেখল, কনকঅর্থাৎ দেবীর চোখের সেই মণিহঠাৎ করে প্রতিমার অক্ষিকোটর থেকে বেরিয়ে এসে যেন বাতাসের উপর দিয়ে ভেসে গেল। আর সেই আলোকরশ্মি গিয়ে মিশে গেল দেবদারু গাছের সবচেয়ে উঁচু ডালটিতে, যেখানে প্রথম শিউলি ফুটেছিল।

আসলে, দেবদারু আর কনক বুঝেছিল যে তাদের এই নীরব প্রেম আর দূরে থাকা অসম্ভব। তারা তাদের চিরায়ত অস্তিত্বের বাঁধন ভেঙে দিয়েছিল। কনক, তার সেই স্নিগ্ধ, পবিত্র দৃষ্টিশক্তি দিয়ে দেবদারুর জীবনের শত বছরের স্মৃতিকে মূর্ত করে তুলল, আর দেবদারু, তার জীবনের চিরন্তন স্থিতধীত্ব দিয়ে কনককে দিল এক নতুন আশ্রয়।

পরের বছর, শিল্পী যখন নতুন প্রতিমা গড়তে এলেন, তখন তিনি অবাক হয়ে দেখলেন, পুরনো দেবদারু গাছের সেই ডালটিতে, যেখানে আলোকরশ্মি মিশেছিল, সেখানে দুই ফোঁটা শিশিরবিন্দু লেগে আছে, যা সাধারণ শিশিরের চেয়ে অনেক বেশি উজ্জ্বল। শিল্পী বুঝলেন, সাধারণ জলবিন্দু নয়, হলো কনক আর দেবদারুর চিরন্তন ভালোবাসার সাক্ষী।

আজও যখন কেউ সেই পুরোনো জমিদার বাড়ির পাশ দিয়ে যায়, তখন তারা বাতাসে এক মিষ্টি শিউলির গন্ধ আর দেবদারু গাছের পাতার মধ্যে এক স্নিগ্ধ জ্যোতি দেখতে পায়।  

 

Sunday, 23 April 2023

 আঞ্চলিক কবিতা ঃ

১। 

"তোক মুই ভালোবাসিছু" - এইখান কেথা শোনার দস্তি সারাদিন ঘুরি বেড়াইছু।  
উয়ায় দেখেছু চুলেই যাছে হাজার মাইল দূরত!
মুইও উয়ার পিছুতি ঘেন্টিয়া সাপের মতোন ছুটে চুলে যাছু।

মাথার উপরতি যেন আগুনের মতোন বাসুকির ফণা,
নীচত সীতার তানে যেরকম মাটিখান ফাইটে গেছিল
সেইরকম কামকাজের তৎপুরুষ সমাসের বাড়াবাড়ি লিয়ে মুইও ছুটে যাছু।
বাদত কেদুর থামিম, নই জানু।
তীর বিন্ধা ক্রৌঞ্চর মতোন মরবার আগুত তাহও 
"তোক মুই ভালোবাসিছু" - এইখান কেথা শোনার দস্তি
সারাদিন ঘুরি বেড়াইছু। 

২। পখি

পখিলাক কবিলা খুব ভালোবাসেছে
পখি লিখেছে
পখি ভাঙ্গিছে
পখিক বেনাছে

পখিলা তারালার মতোন কবিলার লগত
যেন উহাক লিখিলেই স্বর্গ

পখিলাক কবিলা গাছের উপরতি বেশি নি রাখেছে
উহাক নিজের ফেরেমের ভিতরতি টানে লিছে
ব্যায়াম করাছে
দানা খিলাছে
অক্ষরলার প্লবতা রাখেছে পখিলার ডেন্ডাত।
কখনো কখনো উহার বেরেক-আপ করাছে।
পখিলাক লিহেনে কবিলার নানারকম কান্ড-কারখানা।
মুইও খুব ভাবিছু।

এই পখিজন্ম কবিলাও লিবা চাহাছে। 

৩। রবীন্দ্রনাথ

রবীন্দ্রনাথ
কৌস্তুভ দে সরকার 
শিলাইদহ কুনোদিনও নি যাউ,
জোড়াসাঁকোতও যাবা নি পাউ,
বিশ্বভারতীত পড়বার সুযোগ নি হয়;
তাহাও তোমহাক যে কেতে চিনেচু।  

ছোট ক্লাস থেকে পড়া কবিতালা গোটেলায়  আলাও ফোম ছে,  
বাসত,টেরামত,টেরেন, রিক্সা,টোটোত সবখানত তুইহে থাকেচিস; 
তোর কবিতালা শুনবা পাচু নেতালার ভাষণের ভিতরতি,
তোক লিয়ে কেতেলা কাথা কহচে জ্ঞানীগুণীলা...!

নতুন বৌঠানকও কুনোদিন দেখবা নি পাউ;
রাণু,কুনোদিন উহাকও কুনো মেলাত নি দেখু;
তোর অগাধ সমুদ্রের পাড়ত পড়ে রহচু আলাও। 
একেখান জীবনত এতেলা লিখা কী করে সম্ভব?ওইলা ভাবিছু।  
ওইলা গোটেলা,গোটে বাঙ্গালিলা পড়ে উঠিবা নি পারে আলাও। 

শ্রীনিকেতনত কুনোদিনও নি যাউ,
শিলং পাহাড়তও যাবা নি পাউ;
ঘরের লোগোত ছে মংপু
সেইখানতও শুনবা পাছু কী তমার বহুত-লা কীর্তির ফোম ছে
দেখবা নি পাউ! 

কেতে কিছু তমার সম্বন্ধে জানবার বাকি থাকে গেল...!
২৫ বৈশাখ, ২২ শাওন এইনে আসি চলি যাছে
আর মোর বুকের ভিতরতি
তোমহাক
তোমহার গোটেলায় জানবার আটুশ আগ্রহ বারি চুলি যাছে।

জানু,জানু,আর এইটাক সত্য বলে মানিচু - কী 
যেতে দিন বাঙালি আর বাংলা ভাষাখান জিঅত রহে যাবে  
তেতেদিন তমহা চিরভাস্বর থাকি যাবেন - রবীন্দ্রনাথ।

৪। স্বাধীনতা

আমার বেটা আমাক শুধাইলেক,
"উদিকে উরা কি কইরছে গ?
লকগুলা সব গেরুয়া ডেরেশ
মিয়াছিলাগুলা লাচ কইরছে
বাজনা বাইজছে -'জয় সিঁড়ি রাম..."
বেটাক বইললম, "উরা একটা পাটির লক বটে।
ইখানটতে পতাকা তুইলবেক। জাতীয় পতাকা।
আইজকে পইনরো আগস্ট কিনা। তাই
স্বাধীনতা দিবস পালন কইরবেক।
শুন, আমদের লেগে ইগলা না
চল ধানি ক্ষেতে হাল দি।"
যাতি যাতি ফের মাঠের পিছনটাতে দাঁড়ায়ে বেটা শুধাইলেক,
"উদিকে উরা ফের কি কইরছে গ?
লকগুলা সব নীল সাদা ডেরেশ
বাজনা বাইজছে -'খেলা হবে খেলা হবে...'
গানট শুইনে মিয়াছিলাগুলা এমন লাচ কইরছে
যেন ভিডিওওলা ফটো উইঠতে পারে!"
বেটাক বইললম, "উরা আরেক পাটির লক বটে।
ইখানটতে পতাকা তুইলবেক। জাতীয় পতাকা।"
বেটা ফের শুধাইলেক,
"উরা স্বাধীনতা দিবস ভাগ কইরে পালন কইরবেক কেনে?"
বেটাক বইললম, "উরা কুনোদিনও আর একসাথে হবেক লাই।
উদের পাটি আলাদা। তুই বুইঝবি না।
শুন, আমদের লেগে ইগলা না
চল ধানি ক্ষেতে হাল দি।"
উদিক ফের বড় বাহার লাইগেছে আইজ্ঞা শাড়িতে
তিরঙ্গা রঙ লাগাইছে মিয়াছিলাগুলা
আমার বেটা ফের আমাক শুধাইলেক,
" ত আইজ্ঞা উ গুলান কি বটে
সকাল হইত্যে না হইত্যে
গাঁ-টকে বন্দেমাতরম গানে বেইশ বমকাঁই দিছে
ডিজের শব্দতে কানগুলান ছ্যাঁদা ক্যুইরে দিছে
উ কিসের মিটিন?
বেটাক বইললম, "উরাও একটো পাটির লক বটে।
ইখানটতে জাতীয় পতাকা তুইলবেক স্বাধীনতা দিবসের।
শুন, আমদের লেগে ইগলা না
চল ধানি ক্ষেতে হাল দি। চল।"
যাতি যাতি ফের মিয়াছিলাগুলার লাল পাড় শাড়ি
লকগুলার সব লাল জামা ডেরেশ দেইখা বেটা হামাক ফের শুধাইলেক,
"উরা উদিকে ফের কি কইরবে গ?
বাজনা বাইজছে -'পল রবসন...' রক্তে যেন মাদল বাজে
গানট শুইনে লকগুলা কেমন হাত ভাঁজ কইরছে
কাহক যেন স্যালুট মাইরছে! চোঙা ফুইকছে!"
বেটাক বইললম, "উরাও ভিন্ন পাটির লক বটে।
ইখানটতে পতাকা তুইলবেক। স্বাধীনতা দিবসের।"
বেটা ফের শুধাইলেক,
"উরা স্বাধীনতা দিবস নিয়ে এমন ঢং কইরছে কেনে?
কারও সঙ্গে কারও কুনো মিল নাই! কেউ ইখানটতে, কেউ উখানটতে
পৃথক সবাই, বহুত রকম সাইজে গুইজে পতাকা তুইলছে জবর!"
বেটাক বইললম, "উ তুই বুইঝতে পারবি লাই। উদের সব সব্বহারা।
শুন, আমদের লেগে ইগলা না
চল ধানি ক্ষেতে হাল দি। চল।"

৫। গেরামের কাথা

ছোটো ছুয়াপুয়া ভেলা বেনাইচে, সেইটা অমার নাও ;
ডোব্বাডাঙ্গি চেঙ্গেরিগিলা - নদীত ধুইছে গাও !
মাছগিলা ভাগে যাছে সুরবুড়ি, বকরিটা জল খায় ;
ডিমা থাকি ফুটি ব্যাঙাচিলা ফের জলত ভাসিয়া যায় ।
কি আর কহিমো বন্ধু ভাইরে গ্রামের দু:খের কাথা;
ছাতির বদলে মানষিলা দেছে মাথাত কেলার পাতা !
গ্রামের হালুয়া হাল ধরে মাঠে, করোনার ভয় পাছে;
বেটিছুয়াগুলা ঘরের লোগোত শাকপাতা তুলি খাছে।
রাস্তাত শুধু জল আর কাদো, ফাসে যায় চাকা, গাড়ি;
বৃষ্টির জলে ঘর ভাসে যায়, ভাঙিল মাটির বাড়ি।
গ্রামের মানষি কষ্ট করিয়া পঞ্চায়েতত যায়া
তিপল মাঙছে, জি.আর মাঙছে, মাঙছে নেতার ছায়া।
কনেক মিলছে, কনেক মিলে না, দিনলা হইছে পার;
সগায় ভাবেন মন দিয়া ফের এইলা তমার ভোটার।
গ্রামের লোকের কামলা করিলে পাবেন আশীর্বাদ;
বাঁশের মাচার মতন যেন নি ভাঙে ধৈর্য্যের বাঁধ।

৬। আত্মবিশ্বাস

শুন,
হামার উলা কুছু হোবে নি,
করোনা-ফরোনা।
দেখিস, কুন দিনা ভাগে যাবে;
নাকি চুলেই গেল !
হামাক দেখলেই উয়ার ডর লাগে যাছে।
আলা ফের নয়া দিন ওসবে -
গাছত নয়া পাতা নিকলিবে,
কেতেলা নয়া পাখি ওসিল,
আমের মোলের গনলা মুই ঘর তে পাছু;
গাছতলাত কেতেলা ফড়িং, পরজাপতি, ইস
সুরবুড়ি হাবাত মোর মনখান নিকলিবার চাছে।
কিন্তু কুনো উপায় নি ছে,
আলা যে লকডাউন!
শুন,
কুন দিনা দেখব ফের লকডাউন উঠে গেল;
যাবেই একদিন।
লোকলা গোটেলাই ঘর তে নিকলিবে,
ফের বাজার-ঘাট লাগবে, হামার গেরামের মেলা।
আর, ঘরত নি রোম,
চুলি যাম কাম করবা ফের দিল্লি, মুম্বাই, গুজরাট...;
আর যদি নি যাউ তে নি,
ঘরত থাকে যাম;
এইঠাই দিনমজুরী করে কাটে যাবে;
হামার কুনো চিন্তা নি।
শুন,
মোর কাথা চিন্তা না করিস,
তুই ঘরতে রহিস;
তুই বাঁচলে মোর দেশখান বাঁচে যাবে।

৭। স্বাধীনতা

কাহাক কইচে স্বাধীনতা বুঝাই নি পাচু;
কেউ যুদি মোক বুঝাই দেয় ইখান মুই চাহাচু।
বছরলা তো চুলিই যাছে কুনো উন্নতি নি;
প্যায়সা লা যে চুলি যাছে বেহেতা পানি পানি।
জিনিসের দাম বাড়িই যাছে; কাহা চাকরি বাকরি?
স্বাধীনতার মানে টা কি? খিস্সা না ফাকরি!
পতকাখান উড়বা চাহাচে পাখির সঙ্গে মেঘত;
ছোট ছোট ছুয়াপুয়ার জামাই নি ছে দেহাত।
খাবার মিলছে ইস্কুলত, মিলছে জামা জুতা;
শিক্ষা দিবার তানে ইলা পরশাসনের ছুতা।
শিক্ষা লিলেও সঠিক মতন মিলছে শিক্ষা কি?
মোক তাইলে বুঝাই দে স্বাধীনতাখান কি?
বানের জলত ঘর ভাঙ্গে গেল, ভাসেই যাছে জমি;
পতকাখানের নিচত থাড়য় উবজনভুমিক নমি।
একটা দিনের খেলকুদ লা, একটা দিনের মাজা!
স্বাধীনতার মানে খান কি মন্ডা মিঠাই গজা?
ভটের দিনা কেতে পীড়িত, কেতে মিঠো হাসি !
ভোট ফুরালে কায় চিনে মোক? বকরি না মুই খাসি?
গরু ছাগল যেমন রছে অইনে হামরাও রছি;
মোক তমরা বুঝাই দেন স্বাধীনতাখান কি।

৮। বোগিয়া

মোক না কইস বোগিয়া-কাথা, কইবারই না হয়
বেহান বেলাত বোগিয়া খালে কি যে মাজা হয়
আগ-এর ভিতি রাখবা হোবে দশ বারোখান পিঠা
পুড়া চোকলা ফেকিয়া খাবেন খেজুর গুড়ের মিঠা
সিদল সানা শুঁটকি যুদি কপালত ফের জুটে
বুঝাই পাছেন কেমন মাজা খাবেন চাটে চুটে
বোগিয়া হামার দেশিয়া খানা রাজবংশীর কৃষ্টি
ছুয়াপুয়া ডাঙ্গুরিয়ার বোগিয়াতত ছে দৃষ্টি

৯। ইখান মোর মনের কাথা
আলা অসিল দুগ্গাপুজা কি করিম গে আলা ; ভিড়ের ভিতর সেলফি লিলে লোকলা দিবে ঠ্যালা । মোক না লিছে দলত কেহ ঘুরবা একাই হোছে ; মন খানত যে স্বপ্ন কেতে মনত পরি রোছে । সুন্দরীলাক দেখার তানে ঘোরাঘুরির সাধ ; মনখান ফের শুনকে উঠিল বয়স সাধিল বাধ । বেহা করাই হয়নি উচিত পায় গেছু মুই সাজা ; পুজাত নয়া বেটিছুয়ানি মিললে তে না মাজা

১০। সিদ্ধান্ত

ভুটকিভাতাত মুই না জাং মোর উলা কুনো শখ নিছে তমরা ভায়া বৈনি আরো যাও যেতেলা জড়ো হুইসে। মুই আরহ যাম? ডর লাগেছে ! লোকলা দেখছু শীতের দিনা - সগায় মিলে নাচন-কোদন করিচে মুখত মাস্ক বিনা। ভুটকিভাতাত যেইলা খাম গোটেলা কুণ্ঠা চুলি যাবে, তার বাদে ফের খকরখক পেট খান তো ফুলি যাবে। ধরে যুদি ফের মোক করোনা তমরা দেখবা আসিবেন কি? ভুটকিভাতাত মুই না জাং ঘরত খাম সিদল শুটকি !

১১। তমহার চেতনা হোক একলায় বসি ভাবিছু মনত চিনতাত পড়ি গেছু তোমহাক খালি বিনা কামত দেদার নাচিবা দেখেছু দিন মান খান গিলিছ তমরা কেয়জনা ইটা বুঝে পাগলা পাগলি হইছ সগায় আলো কেয়জনা খুঁজে আঁধার হইছে দেশটা ক্রমশঃ শিক্ষা দীক্ষা কামকাজত আজিকা দেখেছু উল্টাপাকায় তমাক ঢুকিবা হবে হাজত কবে যে ফিরিবে চেতনা তমার করিবেন প্রতিবাদ মেরুদন্ড ভাঙিহা বেচিহা হবা পান বরবাদ

১২। মা মুই চাহাছু - মুই ল্যাংটা হোয়ে শুতে রহম, তুই হাতত তেল লিয়ে আগুত মোর পাছাত লাগাবো, তার বাদত সারা গতরে, পিঠত, ঠ্যাংগত, সব ঠিনায়...। মুই উবুর হইনে শুতে রহম, কখুনো সিধা হোবা চাহিম; কখুনো হাসিম, কখুনো কান্দিম, ছটপট করিম; হামাগুড়ি দিবা চাহিম, হাত-পা ছুঁড়াছুঁড়ি করিম...! মুই ফের তোর দুধের ছোট্ট ছুয়া হোবা চাহিম, 'মা'।

১৩। চিনবা পালো ?

মুই করণদিঘির ছুয়া, মোক চিনবা পালো ?
আরে, ডালখোলা, রায়গঞ্জ, তার বিচত করণদিঘি, বলক ইলাকা
আরে, উই যে দোমোহনাত, একবার যে বিরিজখান ভাঙে গেল - সুধানি নদীর উপরতি..
ওইঠিন লক্কর বাবার মন্দিরখান, ফের
রাস্তার ওইপারত রহটপুর হাই মাদ্রাসা
তার বাদত বিকোর হাট, তে পিছলা, ফের করণদিঘি
চিনবা পালো ?
ভিতরতি বহুত লা রাস্তা চলে গেল, গোটেলাই ভাঙা
৩৪ নং জাতীয় সড়কখান করণদিঘির বুকের উপরতি সাপের মতন চলে গিছে
বছর বছর ভাঙে যাছে রাস্তাখান
লোকলা ঠিক করছেই নি
ঠিক মতো কাম করছে নি এন.এইচ-এর লোকলা
'হামার প্যায়সা লা মারে খাছে...'
চৌমাথার পশ্চিমদিকত, যেইটা রাস্তা চলে গেল বলকের ওই পাকা
ওইটা মোর পাড়া, বলক পাড়া।
আলা ফের নাম দিলে "চেতনা সরণী"
চিনবা পালো ?
তার পিছুত ছে পান্ডেপুর
রাস্তাখান সিধা চলে গেল একদম বিহীনগর
বিহার... সুধানী নদী, তেলতা, বারসই...
মোর ঘরের ঠিকানা ছে পান্ডেপুর
একদম বলকের লোগত।
কেতেলা বিডিও অসিল... ফের চলে গেল
কিন্তু রাস্তাখান কেউ নি পাকা করিল
অমরা বলে ফের 'সমষ্টি উন্নয়ন আধিকারিক' !
কাঁচা মাটির রাস্তাত পান্ডেপুরের লোকলা চুলি যাছে
বহুত লা লোক ছে পান্ডেপুরত
আদিবাসী, বিহারী, বাঙালি, মুসলমান, রিফুজি, কেতে...
মমতা দিদি ক্ষমতায় অসিল, ফের বিডিও অফিসখান চকচকায় দিলে
কিন্তু রাস্তার হাল একেই ছে, কেতে দিন হয়ে গেল
সাবধানের রাস্তার কাম হয়ে গেল
করণদিঘির কুনো উন্নতি হছেই নি
বিশ বছর আগুত যেমন ছিলে, আলাও একইরকম থাকে গেল।
নয়া একখান 'কৃষক বাজার' বেনালে হামার মা-মাটি-মানুষের সরকার
একখান হাইস্কুল ছে করণদিঘিত, একখান গার্লস ইস্কুল, কৃষি দফতর,
মডেল ইস্কুল, কেতে কিছু... কিন্তু কোনো কলেজ নি হোল
গ্রামের বেটিছুয়ালা বেশিরভাগ মাধ্যমিকের বাদত পড়াশুনা ছাড়ে দিছে
কে যাবে ফের ডালখোলা আর রায়গঞ্জ কলেজ, বহুত দূর ছে
গ্রামের লোকলার এতেলা প্যায়সা নি ছে যে বেটিছুয়ালাক রোজ রোজ টাউনত পেঠাবে
আর এতেলা পড়ায় হোবে কি, চাকরিখান মিলবে ? এত্তে সোজা
আরে, ওই তানেই তো হামার বেটিছুয়ালাক বেশিরভাগ বিড়ি বেনাবা হোছে
আলা যে মোদী সরকার ফের পানশো আর হাজার টাকার নোটলা বাতিল করে দিলে,
ফের বিড়ি ফ্যাক্টরি লা বন হয়ে গিল
লোকলার কামাই-ধান্দা একবারে বন
ফের শুনবা পাছু কি ব্যাংকের মাধ্যমে নাকি এমার মজুরি লা দিবে
কেতে মুশকিল হোবে আলা, এতেলা লোক আর ব্যাংক মাত্র দু'চারখান
আলা বিড়ির লোকলা দাবি করিল কি, পাড়ায় পাড়ায় ছোট ছোট ব্যাংক করে দিবা হোবে,
কে করবে ?
গ্রামের বেটিছুয়ালা কেতে দূরত টাকা আনবা যাছে, ফের অসছে -
দিনখান তো অইনো চুলি যাছে
বুঝা পালো ? চিনবা পালো মোক ?
মুই করণদিঘির ছুয়া, করণদিঘি হাইস্কুলের পরথম ইস্টার ; মুই কিরণ মাস্টরের ছুয়া,
লুঙ্গি পিনে মোর বা' সারাজীবন কবিতা লিখে চুলে গেল...
ফের একখান পত্রিকা বার করিল - "চেতনা"
করণদিঘির মতো জায়গা, কুনো প্রেস নি ছিলে, কিচ্ছু নি ছিলে
আলা তো মুই উখান চালাছি ইসলামপুরত, চিনবা পালো ?
করণদিঘির লোকলা পরথম বাংলা শিখিল মোর বাপের ঠিন
আগুত বিহার ছিলে উখান
ক্লাশত গিলে শুনবা হোছিল -"হিন্দিমে বোলিয়ে স্যার..."
সেই করণদিঘি, আলা বলে 'উত্তরবঙ্গ উৎসব' হোছে, বইমেলা হোছে... কেতে কিছু...
আলা কেতেলা লোক ছে বাঙ্গালি, মোক চিনবাই নি পাছে অমরা।
মোর বা' যেতেলা কষ্ট করিল...
ইস্কুলের কেস, ফের লোকলার কাথা, সারাজীবন লড়াই করেই কাটায় দিলেন,ইস...
করণদিঘির মতো জায়গাত থাকে কিছু নি করবা পালেন সেরকম।
কিন্তু জেলার একখান বিখ্যাত কবি হিসাবে মোর বা'ক সবাই চিনে
রায়গঞ্জ 'শনিবারের সাহিত্য বাসরের' সভাপতি ছিলেন মোর বা',
আর অন্যকাল পত্রিকার সম্পাদক পবিত্র বর্মন,
ইসসস, পবিত্র কাকু তো ফাঁসি দিয়েই মরে গেল একদিন।
আচ্ছা রবা দে ওইলা কাথা
মোক চিনবা পালো ? মুই করণদিঘির ছুয়া
তবলাডুগি হারমুনিয়া গোটেলাই বাজাবা পাছু
কবিতাও লিখেছু, ইস্কুলত পড়াছু ফের
রায়গঞ্জ কলেজ আর ইউনিভার্সিটির মোর সময়ে মুইই সেরা কবি
রেডিওত কবিতা পড়নু পাঁচ বছর
একবার টিভিত, একবার ফের এফ.এমত...
মুই ইলাকার সাংবাদিক, চিনবা পালো ?
আরে কি চিনবা পাবো, তোমরা তো অইনো... হোয়ে গেল...
মুই তো কিছুই নি।
তোমরা খালি চিনবা পাবেন - নেতা মন্ত্রীক
বিডিও অফিসের লোকলাক
আর যেইলা মাস্তান, পাইসাবালা, ওইলাক...
কিবা চিনব মোক ?
তমার কালচারটাই আলা অমন হোয়ে গেল।
মোর মনে পড়ে যাছে উখান কাথা, রবি ঠাকুরের -
"দেখিতে গিয়াছি পর্বতমালা, দেখিতে গিয়াছি সিন্ধু
দেখা হয় নাই দুচোখ মেলিয়া, ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শিসের উপর একটি শিশিরবিন্দু।"
ওই শিশিরবিন্দুখান মুই, মোক চিনবা পালো?