মুখোশ
কৌস্তুভ দে সরকার
মেদিনীপুরের রাহা রাজবাড়ী থেকে সুলতানি আমলের ‘শাহি-নকশ’ নামক ক্রিপ্টোগ্রাফিক আংটি চুরির খবরটা যখন বিলাত ফেরত তরুণ অপরাধ-বিশেষজ্ঞ অরূপরতন রাহা-র কাছে পৌঁছালো, তখন সে বিস্মিত নয়, বরং কৌতূহলী হলো। তার কাকা প্রতাপরতন রাহা মেদিনীপুরের রাহা রাজপরিবারের শেষ বংশধর, বিরাট বিত্তশালী। তাঁর রাজবাড়ী বহু পুরনো, কিন্তু ভেতরে আধুনিক সিন্দুক। প্রতাপরতন শখের ঘোড়দৌড় আর পুরনো আমলের জিনিসপত্র সংগ্রহের জন্য পরিচিত।
অরূপরতন : "কাকা, আংটিটা চুরি গেল কীভাবে?"
প্রতাপরতন: "আগুন! চারদিকে আগুন আর ধোঁয়া। সিন্দুক ভাঙার কোনো শব্দই শুনতে পাইনি।"
অরূপরতন লক্ষ্য করল, আশ্চর্যজনকভাবে, আগুনটা সিন্দুকে লাগেনি। শুধু তার আশেপাশের শুকনো ঝোপে লেগেছিল। তার সন্দেহ হলো। এত নিখুঁত চুরি, এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো 'শাহেনশা' আছে।
তার এই নতুন তদন্তে সঙ্গী হলো তার ছোটবেলার বন্ধু, স্থানীয় সাংবাদিক ও প্রযুক্তি-পাগল পাপুন সেন। পাপুনের আছে থাকে গোপন ক্যামেরা, ড্রোন, এবং সবচেয়ে বড় কথা, শহর-গ্রামের সব খবর তার নখদর্পণে।
এরপর কয়েক মাসের মধ্যে, বেশ কয়েকটি জায়গায় ডাকাতির ঘটনা ঘটে চললো। পুলিশের পক্ষে কিনারা করে ওঠা মুশকিল হচ্ছিল। তারপর, পুরুলিয়ার জঙ্গল-ঘেরা 'শান্তিনিবাস রিসর্ট'-এ নৃত্যশিল্পী রিপার মর্মান্তিক মৃত্যু অরূপরতনকে বিচলিত করে তুললো। সেখানেও জঙ্গলে কে বা কারা আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল। এই ধরনের অপরাধগুলো কে বা কারা সংঘটিত করছে তা জানতে সে তৎপর হয়ে উঠলো। রিপার মার্ডার এর সাথে তার কাকার সিন্দুক চুরি হওয়ার কোনো সূত্র আছে কি না তা খোঁজার সে চেষ্টা শুরু করলো।
শান্তিনিবাস রিসর্টের একটি পরিত্যক্ত কটেজে পাওয়া গিয়েছিল রিপার নিথর দেহ। রিপা, রূপসী, কিন্তু জীবনযুদ্ধে ক্লান্ত এক ড্যান্সার। সে আসত কলকাতা থেকে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট দেখা যায়, শরীরে আঘাতের চিহ্ন নেই, কিন্তু তার চোখ দেখে মনে হচ্ছিল সে কিছু দেখে মারাত্মক ভয় পেয়েছিল। চোখে আতঙ্ক জমে ছিল।
অরূপরতন ও পাপুন পুরুলিয়া পৌঁছল। তারা জানতে পারল, মৃত্যুর আগের দিন রাতে সে একটি বার-এ ডান্স করছিল এবং সেদিন রাতে তার সাথে একজনের বেশ দীর্ঘ কথোপকথন হয়েছিল। লোকটি ছিল ছদ্মবেশী। পাপুন সেই বর্ণনার ভিত্তিতে কিছু সফটওয়্যার ব্যবহার করে একটি ছবি তৈরি করল, যা তাদের হয়তো কোনো সূত্রের খোঁজ দিতে পারে।
শহরের ভিড়ভাট্টা ছাড়িয়ে যেখানে কংসাবতী নদী বাঁক নিয়েছে তরবারির মতো, সেখানেই ভবানীশঙ্কর মিত্র বাবুর প্রাসাদোপম বাড়ি। নিপাট ভদ্রলোক, অত্যন্ত সজ্জন, পশুপ্রেমী, সমাজসেবী, সর্বোপরি মানবদরদী ভবানীবাবু। পরনে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি, মুখে লেগে থাকা মৃদু হাসি, চুলগুলি উল্টো করে আচড়ানো। সকালে নদীর ধারে তার অ্যালসেশিয়ান অ্যালাস-কে নিয়ে প্রাতঃভ্রমণ করেন, সারাটা দিন কেটে যায় নানান কর্মব্যস্ততায়, সন্ধ্যায় স্থানীয় ক্লাবে তরুণদের অনুপ্রেরণামূলক বক্তৃতা দেন। তাঁর বক্তৃতা শুনতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসে; ভোট এলেই সব দলের নেতা-মন্ত্রীরা তাঁর বাড়িতে ভিড় করেন। সবমিলিয়ে একজন নামীদামী প্রভাব প্রতিপত্তিশালী লোক এই ভবানীবাবু।
কিন্তু রাতের ভবানীশঙ্কর আবার ভিন্ন। তাঁর 'বার্ড রুম'-এর মৃদু লাল আলোয় বসে তিনি দেখেন তার পুষে রাখা পাখিদের, বিশেষত, ব্ল্যাক কাইট (কালো চিল)-দের একটি দল। এরা বাজপাখি ও ঈগলের প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত এবং বিভিন্ন মহাদেশে এদের দেখা যায়; এরা খুব চালাক, সুযোগসন্ধানী এবং আগুন ব্যবহার করে শিকার করার মতো আচরণও করে। যাদের তিনি বলেন 'ফায়ারহক'। এই কক্ষের এক কোণে একটি পুরনো লাট্টু রাখা থাকে, যা ভবানীশঙ্কর মাঝে মাঝে ঘোরান। তিনি মনে করেন, লাট্টুর ঘূর্ণন তার তার দিনের শুরু আর রাত্রি শেষের প্রতীক। আর সেখানেই এক আলমারিতে রাখা আছে বেশ কিছু সুন্দর সুন্দর পুরুষ মুখোশ। দেখে মনে হয় সেগুলি একদম ন্যাচারাল। অরূপরতন সেগুলো মাঝেমধ্যে পরে আয়নায় বারবার নিজের মুখ দেখেন। এতে তিনি বেশ মজা পান।
ভবানী বাবুর প্রাসাদোপম বাড়ি দেখে ওদের সেই বাড়িতে থাকার খুব লোভ হলো। অরূপরতন পাপুনকে উৎসাহিত করল। বলল, "চল উনার বাড়িতে থাকার একটা ব্যবস্থা করি। "
"ভবানীশঙ্করবাবু কেন আমাদের মতো সামান্য মানুষের সঙ্গে কথা বলবে, বা থাকতে দেবে? - পাপুন বলল।
অরূপরতন ততক্ষণে তার পকেট থেকে ভবানীশংকর বাবুকে লেখা মেদিনীপুরের বিধায়কের একটি চিঠি বের করে ফেলেছে। সেটি পাপুনকে দেখিয়ে সে বলে, " আরে আমি কি অত কাঁচা খেলুড়ে নাকি? এখানে যে কয়দিন থাকবো, তার জন্য ফ্রিতে থাকা খাওয়ার পাকা ব্যবস্থা করে এনেছি। মেদিনীপুরের বিধায়ক সুচন্দনবাবু আর ভবানীবাবু দুই অভিন্ন হৃদয় বন্ধু। তাই তার চিঠি নিয়েই চলে এসেছি।
অরূপরতন ও পাপুন ভবানীশঙ্করের প্রাসাদোপম বাড়ির অতিথি হলেন। ভবানীশঙ্কর তাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালেন। সাদা পাঞ্জাবি, মৃদু হাসি – যেন মানবিকতার প্রতিমূর্তি।
ভবানীশঙ্কর : "দ্যাখো অরূপরতন, আমার জীবনদর্শন খুব সহজ। জীবনে দুটি জিনিস দরকার—শৃঙ্খলা এবং পরিবেশের প্রতি সহানুভূতি। আমি পাখি পুষি, কারণ ওরা আমাকে স্বাধীনতার পাঠ দেয়। তোমরা এসো, আমার ‘বার্ড রুম’ দেখবে।"
'বার্ড রুম'-এর মৃদু লাল আলোয় তারা ব্ল্যাক কাইটদের দেখল। অরূপরতন লক্ষ্য করল, লাল আলোয় পাখিদের চোখগুলো অস্বাভাবিকভাবে জ্বলজ্বল করছে। কোণে রাখা লাট্টুর দিকে দেখিয়ে অরূপরতন (কৌশলী হয়ে): "স্যার, এই লাট্টুটা কি আপনার কোনো প্রতীক? আর ওই মুখোশগুলো?
ভবানীশঙ্কর: "হাঃ হাঃ! ঠিক ধরেছো। এটা আমার দিনের শুরু আর রাত্রির শেষের প্রতীক। ঘুরতে থাকে, ঘুরতে থাকে... যেমন জীবনের গোপন চক্র। আর মুখোশগুলো আমার খুবই পছন্দের। বলে তিনি হাসতে হাসতে তার অ্যালাস এর গায়ে হাত বুলিয়ে দিলেন।
ওদিকে, পাপুন নিঃশব্দে একটি পোর্টেবল স্ক্যানার দিয়ে ঘরের বাতাসে থাকা ধুলিকণা স্ক্যান করতে লাগল।
অরূপরতন: "স্যার, আপনার পাখিগুলো দারুণ। আর, অ্যালাস কি আপনার সব সময়ের সঙ্গী?"
ভবানীশঙ্কর: "অ্যালাস? সে আমার ছায়া। ওর আনুগত্য প্রশ্নাতীত। দাঁড়াও আমি তোমাদের জন্য চা-পানের ব্যবস্থা করি।" এই বলে ভবানীশংকর বাবু ভেতর ঘরের দিকে চলে গেলেন।
এরই মধ্যে পাপুনের স্ক্যানারে একটি অদ্ভুত ফলাফল এলো। বাতাসে ফসফরাসের অতি ক্ষুদ্র কণা, যা সাধারণত আতশবাজিতে বা বিশেষ ধরনের বারুদে ব্যবহৃত হয় এবং অ্যালাসের কলার থেকে আসা একটি অতি ক্ষীণ রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি সিগন্যাল।
অরূপরতন বুঝতে পারল না ব্যাপারটা কি।
সেদিন রাতে ভবানীশঙ্কর তাদের জন্য নৈশভোজের ব্যবস্থা করলেন। ভবানীশঙ্কর যখন বাইরে গেলেন, পাপুন অ্যালাসের কলার থেকে সিগন্যাল ট্র্যাক করে দেখল – সিগন্যালটি কংসাবতী নদীর একটি নির্দিষ্ট বাঁকের দিকে যাচ্ছে।
অন্যদিকে অরূপরতন চুরির রহস্যের কেন্দ্রে পৌঁছানোর জন্য যারপরনাই চেষ্টা করে চলেছে। 'শাহি-নকশ' আংটি। সে তার কাকার রাজবাড়ীর নকশা মেলে ধরে তা পুনরায় বিশ্লেষণ করা শুরু করলো। প্রতাপরতনের সিন্দুক আধুনিক হলেও, সিন্দুকের ভিত্তিটি ছিল রাজবাড়ীর দেয়ালের সঙ্গে সংযুক্ত। সেখান থেকে আংটি চুরির ক্ষেত্রে আগুনের কি সম্পর্ক? এইসব ভাবতে ভাবতে একটি সিগারেট টানতে টানতে অরূপরতন ভবানীবাবুর ঘরের একটি আলমারিতে রাখা পুরনো বইপত্র দেখছিল। হঠাৎ
অরূপরতনের চোখ পড়ল ফেলুদা সমগ্রের শেষের পাতায় রাখা একটি ছবির দিকে। ছবিটি দেখতে গিয়ে সেটি বই থেকে মাটিতে পরে গেল। আর ততক্ষণে ভবানীবাবুর গলার আওয়াজ পেয়ে অরূপরতন ঝটপট করে ছবিটি তুলে সেটি পকেটে পুরে নিল।
পরদিন সারাদিন ভবানীবাবু অরূপরতনদের নিয়ে নদীর পাড় ধরে অনেকটা ঘুরে বেড়ালেন। ঘুরতে ঘুরতে অরূপরতনদের এখানে আসার উদ্দেশ্য জানতে পেরে ভবানীবাবু তাদের বললেন, "বা:, দারুন ব্যাপার তো। তোমার মতো এরকম একজন মানুষের দেখা পাওয়া তো বেশ ভাগ্যের ব্যাপার। জানো, আমারও একসময় গোয়েন্দাগিরিতে খুব শখ ছিল। কিন্তু সময় করে উঠতে পারিনি। যাকগে, শোনো, তোমরা এখানে যে কয়দিন আছো, আরামসে থাকো। ঘোরো ফেরো। আমার তো বেশ নামডাক এ শহরে। তোমরা কোনো দ্বিধা করবে না। যখন যে বিষয়ে সাহায্য দরকার আমাকে বলবে, আমি সবরকম সাহায্যের জন্য সবসময় প্রস্তুত।"
সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে অরূপরতন কলকাতা পুলিশের অতিরিক্ত সুপার দীপাঞ্জন সান্যাল-এর কাছে ফোন করল: "স্যার, আমি চেষ্টা করছি রহস্যের জাল উন্মোচনের। আপনি কিন্তু তৈরি থাকবেন। যেকোনো সময় আপনাকে প্রয়োজন হতে পারে।
অরূপ রতনের কথা শুনে পাপুন একটু অবাকই হলো। অরূপরতন কি এমন পেয়েছে যে সে এরকম করে বললো পুলিশ অফিসারকে। যাইহোক,
পরদিন খবরের কাগজ পড়ে তারা জানতে পারল, রিপার প্রেমিক পুলক, যে কিনা ড্রাগ মাফিয়া চক্রের ছোট ডিলার, সে নিখোঁজ। অরূপরতন অনুমান করল, রিপার মৃত্যু কেবল প্রতিশোধ নয়, বরং একটি গোপনীয়তার প্রাচীর হতে পারে।
হয়তো, রিপাকে পুলক নয়, বরং ড্রাগ মাফিয়াদের হেডই মেরেছে। কারণ রিপা পুলককে ভালোবেসে তার অন্ধকার জগৎ থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিল। রিপা স্বপ্ন দেখত দুজনের এক শান্ত নিরিবিলি জীবন। এসব নিয়ে পুলকের সাথে ঝগড়া, মান-অভিমান লেগেই থাকত এবং তার কাছে কোনো অত্যন্ত গোপন তথ্য ছিল। রিপা কোনো নেটওয়ার্কের গোপনীয়তা ভাঙছিল। তাই পুলকের হেড রিপাকে সরাতে বাধ্য হল।
অরূপরতন বোঝার চেষ্টা করছিল, তার কাকার চুরি যাওয়া আংটিটার সাথে রিপার মৃত্যুর কোন সম্পর্ক আছে কিনা। তার মনে হল, আংটিটা ছিল একটি অ্যান্টিক, যা এক বিশেষ ধরনের ক্রিপ্টোগ্রাফিক কোড লুকিয়ে রাখত। এই কোড ব্যবহার করে একটি নির্দিষ্ট এয়ার-ট্রেড-রুট ধরা হয়, যা সাধারণ রাডারে ধরা পড়ে না, বরং চোরাই মাল পাচারের নিরাপদ রুট তৈরি করে। আর রিপা হয়তো এইসব জেনে গিয়েছিল।
অরূপরতন ও পাপুন ছক কষল। তারা কলকাতা পুলিশের অতিরিক্ত সুপার দীপাঞ্জন সান্যাল-এর সঙ্গে আবার যোগাযোগ করল। বলল, গোপনে 'বড় মাছ' ধরতে হলে আজ রাতেই চলে আসুন। একটি শর্তে দীপাঞ্জনবাবু রাজি হলেন, তা হল, ক্রিমিনালকে হাতেনাতে ধরতে হবে।
অরূপরতন এবার ফাইনাল ফাঁদ পাতল। পাপুন একটি ভুয়ো খবর দ্রুত ছড়িয়ে দিল যে, রাহা রাজপরিবারের একটি বিরল পান্না ও একটি পুরনো সুলতানি পুঁথি কংসাবতী নদীর সেই বাঁকে একটি গোপন কুঠুরিতে লুকিয়ে আছে, বলে খবর পাওয়া গেছে। শুনে ক্রিমিনাল গ্যাং নিশ্চয়ই প্রলুব্ধ হবে। দেখা গেল সত্যি সত্যিই, রাত দুটোয় এক দুষ্কৃতী তার দলবল নিয়ে কংসাবতীর ধারের কাছে তৈরি। আর সেখানে নদীর ধারে ঘুরে বেড়াচ্ছে একটি কুকুর। সে যখনই নদীর জলের গভীরে গুপ্তধনের খোঁজে ডুব দিতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই দীপাঞ্জন সান্যালের নেতৃত্বে পুলিশ বাহিনী চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলল।
অরূপরতন (দৃঢ় কণ্ঠে): "ভবানীশঙ্কর মিত্র, ভবানীশঙ্কর মিত্র, আপনার লাট্টু থেমে গেছে।
ভবানীশঙ্কর : কে ভবানীশঙ্কর? এখানে ভবানীশঙ্করকে কোথায় পেলেন? ভালো করে দেখুন তো, এই মুখ ভবানীশঙ্করের সাথে মেলে কি না।
এই বলে ভবানীবাবু তার ইমেজ বজায় রাখার জন্য মুখোশের আড়ালে নানাভাবে প্রমাণ করতে চাইলেন যে তিনি অন্য কেউ, ভবানীশংকর নন। কিন্তু অরূপরতনও কম যায় না। সে ভবানী বাবুর আসল পরিচয় জানতে পেরে গিয়েছে। কারণ, রিপার মৃত্যুর আগের দিন রাতে সে যার সাথে কথা বলছিল পাপুন তার যে স্কেচ তৈরি করেছিল, সেই স্কেচের সাথে মুখের মিল ছিল ভবানীশংকর বাবুর বইয়ের ভিতরে পাওয়া সেই ছবিটিতে। অরূপরতন তাতেই সিওর হয়ে গিয়েছিল যে ভবানীশংকর বাবুই স্কেচের সেই লোক।
অরূপরতন : "আলবাত মিলবে। এই দেখুন, আপনার মুখোশ আমি টেনে খুলে দিলাম।" বলেই অরূপরতন এক টান দিয়ে ভবানীশঙ্করের মুখ থেকে তার মুখোশ টেনে খুলে ফেলে দিল। আর সাথে সাথেই সেই স্কেচ করা ছবির সাথে একদম হুবহু মিল পাওয়া যায় এরকম একটি মুখের দেখা পাওয়া গেল।
অরূপরতন : সবাই দেখুন, এই সেই অরিজিনাল ভবানীশঙ্কর। উনার বাড়িতে একটি বইয়ের থেকে পাওয়া একটি ছবিতে আমি উনাকে আবিষ্কার করি। রিপার মার্ডারের দিনে যাকে অনেকক্ষণ রিপার সাথে গল্প করতে দেখা গিয়েছিল। সেই স্কেচের সাথে ওই মুখের মিল আমি পেয়েছিলাম। আর বাড়িতে বা সমাজে উনি অন্য এক মুখোশ পরে ঘুরে বেড়াতেন। আজকে নদীর ঘাটেও এসেছিলেন তিনি অন্য মুখোশ পরে। যাতে কেউ বুঝতে না পারে। এভাবেই নানান মুখোশের আড়ালে প্রকৃত অপরাধ ও অপরাধীকে গোপন করে চলছিলেন ভবানীশংকর।
এবার অরূপরতন ভবানীশঙ্করের দিকে তাকিয়ে বলা শুরু করল, "ভবানীশঙ্কর, আপনি ফায়ারহককে ব্যবহার করে নজর ঘোরাতেন, আর অ্যালাসের মতো প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুরকে দিয়ে চুরি করাতেন। রিপা এই সত্য জেনেছিল, তাই তাকে সরালেন। 'শাহি-নকশ'-এর ক্রিপ্টোগ্রাফিক কোড আপনার চাবিকাঠি হতে পারতো। আপনি আংটিটি চুরি করেছিলেম তার ভেতরের কোডটি পাওয়ার জন্য। আপনি 'ফায়ারহক' ব্যবহার করতেন আগুন লাগিয়ে পুলিশ আর গোয়েন্দাদের দৃষ্টি ভিন্ন দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য। আসল চুরিটা হতো 'অ্যালাস' এবং আপনার দলের মাধ্যমে, যখন চারদিকে আগুন আর ধোঁয়ার কারণে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতো। আর সেই মুহূর্তে একটি নির্দিষ্ট এয়ার ট্র্যাফিক রুটের আড়ালে হেলিকপ্টার ব্যবহার করে মাল পাচার করতেন। রিপা পুলকের মাধ্যমে জেনে গিয়েছিল যে আপনি ব্ল্যাক কাইট দিয়ে আগুন লাগান, কিন্তু আসল চুরিটা অ্যালাসের সঙ্গে আপনার লোকজন করে। এই তথ্য ফাঁস করার হুমকি দেওয়ায় তাকে মরতে হয়।
ভবানীশঙ্কর হাসল। সেই নিপাট ভদ্রলোকের হাসি। "তুমি শুধু একটা অংশ জানো, অরূপরতন। এই লাট্টু ঘোরার শেষ নেই।"
হঠাৎ করেই, ভবানীশঙ্করের লোকজনের একটি অংশ পুলিশের ওপর গুলি চালাল। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলো। এই সুযোগে অ্যালাস নদীর দিকে দৌড়ে পালাল। অ্যালাসের কলারের সিগন্যাল ট্র্যাক করে পাপুন নদীর একটি বিশেষ জায়গায় পৌঁছাল।
পাপুন চিৎকার করে উঠল: "অরূপরতন! এখানে! নদীর বাঁকে!"
পুলিশের গুলির মোকাবিলা শেষ হতেই অরূপরতন দেখল, কংসাবতী নদীর বাঁকের নিচে, পাথরের আড়ালে, ভবানীশঙ্করের জল-প্রতিরোধী গোপন গুদাম। অ্যালাসের কাজ ছিল ভবানীশঙ্করের ধরা পড়ার আগে সেই গুদামের শেষ মালপত্রগুলি সরিয়ে ফেলা। কিন্তু পাপুনের প্রযুক্তি তাকে সেই কাজে সফল হতে দেয়নি। গুদামে পাওয়া গেল চুরি যাওয়া সব সম্পদ।
ভবানীশঙ্কর ধরা পড়ল। 'বার্ড রুম'-এর লাল আলো নিভে গেল। অরূপরতন ও পাপুন তাদের প্রথম বড় রহস্যভেদ করে তাকালো নদীর দিকে।